আলোচিত সংবাদ
সত্যের কথা বলে

নিউ লাইন ক্লোথিং ঋণের ভারে জর্জরিত,ভুয়া অ্যাডভান্স এবং রিসিভাবলসে সয়লাব

স্বপ্ন রোজ : দেশের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের রক্তক্ষরণ চলছেই। অব্যাহত দরপতন প্রতিনিয়ত বিনিয়োগ করা পুঁজি হারাচ্ছে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী । কোনো কিছুই শেয়ারবাজারকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারছে না। দিনের পর দিন দরপতন হওয়ায় ধীরে ধীরে তলানিতে যাচ্ছে শেয়ারবাজার। আর এই দরপতনের মূল কারণই হচ্ছে মনগড়া কারসাজি আর্থিক প্রতিবেদন। কারসাজির এই খেলায় এক ধাপ এগিয়ে নিউ লাইন ক্লোথিং লিমিটেড।

নিউ লাইন ক্লোথিং লিমিটেড কোম্পানির পরিচালকেরা প্রসপেক্টাসে বিনিয়োগকারীদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য নানা মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়েছে।ব্যবসা সম্প্রসারণ করবে ,পরিশোধ করা হবে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ। দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক ঋণের এর সুদ মেটাতে গিয়ে সঠিকভাবে কোম্পানি পরিচালনা করতে পারছে না এতে করে মন্দ ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি সেই ঋণের বোঝা কমিয়ে নিউ লাইন ক্লোথিং লিমিটেড কোম্পানিটি স্বচ্ছ ও নির্ভেজাল ভাবে ব্যবসা পরিচালনা করার আশ্বাস দিয়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে। অথচ দিন যত যাচ্ছে ততোই বাড়ছে ব্যাংকের ঋণ ।

কোন একটা ঋণ পরিশোধ হলে, অন্য আরেকটা ঋণ নিচ্ছে কোম্পানির পরিচালকেরা এতে করে বছরের পর বছর চলছে একই নিয়মে। আর এই নিয়ম ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকলে অচিরেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অন্যান্য গার্মেন্টস কারখানা গুলোর মত অস্তিত্ব বিলীনের পথে হাঁটছে নিউ লাইন ক্লোথিং। নিউ লাইন ক্লোথিং লিমিটেড কোম্পানিটির মোট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ প্রায় =১২৭ কোটি টাকা । এরমধ্যে লং টার্ম লোন=৭৯ কোটি ৪৯ লাখ ৬২ হাজাার ৭৪৩ টাকা। ব্যাংক ওভারড্রাফট=১৭ কোটি ৮৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। কারেন্ট পরশন অফ লং টার্ম লোন=১২ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা। শর্ট টার্ম লোন=১৩ কোটি ৯৪ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬৫ টাকা। এছাড়াও ফোর্স লোন =৩ কোটি ২৭ লাখ ৩২ হাজার ৫২২ টাকা। আর এসব ঋণের ইন্টারেস্ট দিতে হিমশিম খাচ্ছে কোম্পানিটি।

২০১৮ সালের তুলনায় কোম্পানিটির লং টার্ম লোন বেড়েছে (৭৯৪৯৬২৭৪৩-১৯৪০৬৬৭৬২)=৬০ কোটি ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৯৮১ টাকা। ব্যাংক ওভারড্রাফট বেড়েছে (১৭৮৪৩৮৫২৫-১৭৯৯৯৩৫০৪)=৮৪ লাখ ৪৫ হাজার ০২১ টাকা। কারেন্ট পরশন অফ লং টার্ম লোন বেড়েছে (১২১১২০০০০-১১৯৬১০০০০)=১৫ লাখ ১ হাজার টাকা। ফোর্স লোন বেড়েছে=৩ কোটি ২৭ লাখ ৩২ হাজার ৫২২ টাকা।

মোট লোন এর পরিমান প্রায় =১২৭ কোটি টাকা। উক্ত লোনের ইন্টারেস্ট দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রকৃতপক্ষে ইন্টারেস্ট হওয়ার কথা প্রায় =১৫ কোটি টাকা। কাজেই ব্যাংক লোনের ইন্টারেস্ট খাতে কম দেখানো হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।অর্থাৎ ব্যাংক লোনের ইন্টারেস্ট খাতে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার উপরে manipulation (কারসাজি) করা হয়েছে।

অন্যদিকে নিউ লাইন ক্লোথিং এর ভুয়া অ্যাডভান্স ও ইনভেন্টরিজ এবং রিসিভাবলসে সয়লাব। ইনভেন্টরিজ দেখিয়েছে- ৭৪ কোটি ৯৫ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭৯ টাকা। এরমধ্যে কাঁচা মাল- ৬৬ কোটি ৬৫ লাখ ৫৩ হাজার ১৩৫ টাকা।কাজ চলছে- ১১ কোটি ১৪ লাখ ৫ হাজার ৩৯২ টাকা।তৈরি পণ্য- ৭ কোটি ১৬ লাখ ৯ হাজার ৯৫২ টাকা।

একাউন্টস রিসিভাবল দেখিয়েছে- ৬৬ কোটি ৪০ লাখ ১৪ হাজার ৪৫৬ টাকা। এরমধ্যে গোল্ডেনফিনিং (gmbh) এর ৩৯ কোটি ৯৯ লাখ ২৩ হাজার ৪৪০ টাকা । মাস্টারটেক ইন্টার্নেশনাল লি: এর ২২ কোটি ৮১ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫৯ টাকা। সেন্ট্রো ইন্টার্নেশনাল সোর্সিং লি: এর ২ কোটি ৮৪ লাখ ৪৫ হাজার ৯০০ টাকা। বেস্ট সেলার এর ৭৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৭ টাকা।

অ্যাডভান্স ডিপোজিট এন্ড প্রি পেমেন্ট দেখিয়েছে-৩১ কোটি ৯৬ লাখ ৩ হাজার ৮৫৮ টাকা। এরমধ্যে অ্যাডভান্স- ২৭ কোটি ৬০ লাখ ৬৫ হাজার ৪৫৭ টাকা। ডিপোজিট-১৪ লাখ ৯ হাজার ৮৮৫ টাকা। প্রি পেমেন্ট-৬ লাখ ৫৩ হাজার ৬১৪ টাকা। ডিপোজিট ফর বিবিএল/ সি- ৪১ কোটি ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৯০২ টাকা।

বিভিন্ন পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী ব্যাংকের ঋণ নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে। কিন্তু এইসব অভিযোগ এর বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই কোম্পানিটির ২০১৮_২০১৯ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনে।২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনের ৪৯ পৃ: তথ্য অনুযায়ী জানা যায় কোম্পানিটির ক্যাশ এন্ড ক্যাশ একুইভ্যালেন্টস ৩৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এরমধ্যে ক্যাশ ইন হান্ড=৮ কোটি ৫১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৩৪ টাকা। ক্যাশ এট ব্যাংক = ২৮৭,৮৭৯,২০৫ টাকা।যে কোম্পানি ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে।নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না, সে কোম্পানির কিনা ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা অফিসে ক্যাশ হাতে আছে , এ যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য। সাধারণত ব্যাংকের ব্রাঞ্চ এর ক্যাশ গুলোতেও নগদ ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা থাকে না।

Annual report  ২০১৯  এর ৬৭ পৃ: তথ্য অনুযায়ী নিউ লাইন ক্লোথিং এর ফোর্স লোন=৩ কোটি ২৭ লাখ ৩২ হাজার ৫২২ টাকা। ফোর্স লোন তখনই হয় যখন কোন কোম্পানি পণ্য ইমপোর্ট করার পর নির্ধারিত সময়ে পেমেন্ট পরিশোধ করতে পারে না । force loan এর অর্থ নিউ লাইন ক্লোথিং লিমিটেড পণ্য ইমপোর্ট করার L/c payment সঠিক সময় করতে পারছে না। যে কোম্পানি ইমপোর্ট করা পণ্যের L/C পেমেন্ট নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে না পারায় উক্ত টাকা ফোর্স লোন হিসাবে ১৩.৫০% অনুযায়ী ইন্টারেস্ট দিচ্ছে সে কোম্পানির কাছে ক্যাশ ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা থাকা গল্প মাত্র।

প্রসপেক্টাসের ১৮৪ পৃ: তথ্য অনুযায়ী ফোর্স লোন অতীতেও ছিল। শুধুমাত্র cash-flow পজেটিভ দেখানোর জন্যই ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা হাতে আছে তা কাগজে কলমে দেখানো হয়েছে। উচ্চমাত্রার ঋণ কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা অত্যান্ত দূর্বল ৷ কাজে ধারণা করা হচ্ছে অতি শীঘ্রই কোম্পানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় নিউ লাইন ক্লোথিং লিমিটেড।

কৃত্তিম রেভিনিউ এবং কৃত্তিম স্থানী বিনিয়োগ কোম্পানির অধিকতর সচ্ছলতার শিরোনাম যেন আকাশছোঁয়া। আর শিরোনামের অংশ হিসেবে বেড়েছে স্থায়ী বিনিয়োগ,অ্যাডভান্স ইনভেন্টরিস, আর বেড়েছে রিটেইনড অ্যার্নিংস

স্থায়ী বিনিয়োগ :প্রসপেক্টাসে তথ্য ও আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায় কোম্পানি কয়েক বছর ধরে স্থায়ী বিনিয়োগ দেখিয়ে আসছে। প্লান্ট ও মেশিনারিজ, অফিস ডেকোরেশন ও অফিস ইকুইপমেন্ট ক্রয় ইত্যাদি হিসাব । বিল্ডিং ও সিভিল খাত, প্লান্ট ও মেশিনারিজ ক্রয় সহ বিভিন্ন খাতে কয়েক বছর ধরেই চলছে বিনিয়োগ। প্রতিবছরের অবাক করা বিনিয়োগ গুলো যে কাউকে ভাবতে বাধ্য করাবে। আসলে কি বিনিয়োগ হচ্ছে , নাকি কারসাজির আর্থিক প্রতিবেদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

প্রসপেক্টাসের ২৪১ পৃ: তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে স্থায়ী বিনিয়োগ =৫ কেটি ৯২ লাখ টাকা। এরমধ্যে বিল্ডিং এন্ড সিভিল ওয়ার্কস= ৩ কোটি ২২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৭০ টাকা। ইলেকট্রিক ইকুইপমেন্টস=৩৮ লাখ ১২ হাজার ৯২৮ টাকা। ফার্নিচার এন্ড ফিক্সটার=৫০ লাখ ১৮হাজার ২৩৬ টাকা। অফিস ইকুইপমেন্টস=১ লাখ ৬২ হাজার ৭৫০ টাকা।ফায়ার ইকুইপমেন্টস=১ কোটি ৪২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১০ টাকা। কম্পিউটার এন্ড এক্সোসরিজ=১ লাখ ১১ হাজার ৭৩০ টাকা। স্পেয়ার্স এন্ড এক্সেসরিজ=৩৫ লাখ ৩৮হাজার ৫১২ টাকা।

Annual report ২০১৯  এর ৭৪ : তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে স্থায়ী বিনিয়োগ =১৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এরমধ্যে বিল্ডিং এন্ড সিভিল ওয়ার্কস= ৮ কোটি ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫০ টাকা। প্লান্ট এন্ড মেশিনারিজ=৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫০০টাকা।ইলেকট্রিক ইকুইপমেন্টস=৩ কোটি ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ১০২ টাকা।ফার্নিচার এন্ড ফিক্সটার=৪ লাখ ৬৫ হাজার ৩৭০ টাকা। অফিস ইকুইপমেন্টস=৪ লাখ ৮৮ হাজার ৩৫০ টাকা।ফায়ার ইকুইপমেন্টস=১০ লাখ ৯১ হাজার ৯৪৩ টাকা। কম্পিউটার এন্ড এক্সোসরিজ =১ লাখ ৯ হাজার ৭৪০ টাকা। স্পেয়ার্স এন্ড এক্সেসরিজ=২ কোটি ৯৭ লাখ ৪৫ হাজার ৯১০ টাকা।

শিয়াল পন্ডিত ও কুমিরের গল্প টা সবারই জানা।একটা বাচ্চা কুমিরকে দিনের পর দিন দেখিয়ে এসেছিল শিয়াল পন্ডিত। নিউ লাইন ক্লোথিং লিমিটেডের স্থায়ী বিনিয়োগ অনেকটা শিয়াল পন্ডিত ও কুমিরের গল্পের মত। একই ভাবে বিনিয়োগ বারবার দেখিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে।

নিজের ইচ্ছা মত কোথাও বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকগুণ আবার কোথাও কমিয়ে ফেলছে কয়েকগুণ। যাতে করে profitably এবং eps এর প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে বাজারে শেয়ার মূল্যের কৃত্তিম প্রবৃদ্ধি ঘটানো যায়। এই manipulation এর উদ্দেশ্য থাকে placement share এর maturity সময় যাতে বাজার মূল্য সর্বোচ্চ পর্যায় থাকে এবং উদ্দোক্তাগন তাদের হাতে থাকা নামে-বেনামের শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে মোটা অংকের টাকা তুলে নিজেরা মোটাতাজা হতে পারে। আর এই বাড়ানো কমানোর ফাঁদে পড়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীগন তাদের সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে। কারসাজির এই ফাঁদের নামই শেয়ারবাজারের মরণফাঁদ। বছরের-পর-বছর এই অসত্য আর্থিক বিবরণীর উপর আটকে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীরা।

আলোচিত সংবাদ/ ১-১১-২০২০ ইং

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.