আলোচিত সংবাদ
সত্যের কথা বলে

ঋণ পরিশোধের জন্য আমরা পাঁচ বছর সময় চেয়েছি” বিজিএমইএ

দেশের গার্মেন্টস মালিকরা মহামারি করোনাকালে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তাদের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু ব্যাংক থেকে নেওয়া সেই ঋণের টাকা আগামী ৫ বছরের আগে তারা ফেরত দিতে চাইছেন না। এ নিয়ে সরকারের কাছে লিখিতভাবে আবেদনও করেছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সম্প্রতি সংগঠনটির পক্ষ থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। এর অনুলিপি অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও পাঠিয়েছে সংগঠনটি।

চিঠিতে করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত রফতানিমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা দিতে সরকার ঘোষিত তহবিলের মেয়াদ দুই বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছর করার দাবি জানানো হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, করোনার প্রভাবে দেশের রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনও তারা করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ক্রেতারাও এখনও সক্রিয় হননি।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআই’র সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘ঋণ পরিশোধের জন্য আমরা পাঁচ বছর সময় চেয়েছি।’পাঁচ বছর সময় চাওয়ার পেছনে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এই বিশেষ প্রণোদনাটা দিয়েছিল সরকার। এটি সরকারি সহায়তা। কাজেই আমরা সরকারের কাছে পাঁচ বছরের জন্য আবেদন করেছি।’ তিনি উল্লেখ করেন, আমরা এখনও ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এরই মধ্যে দ্বিতীয় ধাপের করোনা আসছে। ইতোমধ্যে ইউরোপের দেশগুলো আবারও লকডাউনে যাচ্ছে। ফলে আমাদের ক্ষতি যে কোথায় গিয়ে থামবে, তা আমরা কেউ জানি না। সরকার বিষয়টি অনুধাবন করে ঋণ পরিশোধের জন্য নিশ্চয়ই আমাদের পাঁচ বছরের সুযোগ দেবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রসঙ্গত, দেশে এই করোনাকালে খাত হিসেবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে রফতানিমুখী পোশাক শিল্প। এই খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ যেমন বেশি পেয়েছেন, তেমনই তাদের সুদও দিতে হয়েছে নামমাত্র। তিন দফায় সরকারের দেওয়া মোট ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা পেয়েছেন তারা। খাতটি আরও ঋণ চেয়েছিল, কিন্তু সরকারের সায় না থাকায় তারা ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর সময় চাচ্ছে।

বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বর্তমানে পোশাক খাত গভীর সংকটময় সময় পার করছে। এ অবস্থায় আগামী দুই বছরের মধ্যে এ অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এর মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়ে পাঁচ বছর করলে উদ্যোক্তাদের পক্ষে ঋণের টাকা পরিশোধ করা সহজ হবে।

এদিকে বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, টানা দুই মাস বৃদ্ধির পর আবারও পোশাক রফতানি নেতিবাচক ধারায় ফিরছে। সংগঠনটির হিসাবে, বিদায়ী অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ১৯২ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম। গত বছরের ১ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ২০৪ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছিল।

পোশাক শিল্প নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেম ও মাইক্রোফাইন্যান্স অপরচুনিটিসের (এমএফও) আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক ওয়েবিনারে অংশ নিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক জানান, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে পোশাক রফতানি বৃদ্ধি পেলেও অক্টোবরে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমেছে। ফ্রান্সে লকডাউন চলছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে।

বিজিএমইএ’র মতো গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের আরেক সংগঠন বিকেএমইএ’ও ঋণের মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘সরকারের সহায়তা ব্যাংকের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি। এখন ব্যাংকও আমাদের সহায়তা করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘সংকট না কাটতেই যখন দুনিয়াজুড়ে করোনার দ্বিতীয় ধাপ আসছে, তখন আমরাও চিন্তিত।’ তিনি উল্লেখ করেন, আমরা টাকাটা শোধ দিতে চাই। খেলাপির তকমা নিতে চাই না। এ কারণেই আমরা প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে নেওয়া ঋণ দুই বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছর সময় চাই। তিনি বলেন, ‘এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড ও চার বছরে শোধ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া না হলে অধিকাংশ ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে পড়বেন।’

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান মনে করেন, যারা ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে চান না, অথবা ফেরত দেওয়ার জন্য পাঁচ বছর সময় চান, তাদের কোনও প্রণোদনা দেওয়া উচিত নয়। তিনি উল্লেখ করেন, গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য সময় চাইলেও কৃষকরা এই করোনাকালেই ঋণের টাকা ফেরত দিচ্ছেন। কৃষকরা পারলে ব্যবসায়ীরা পারবেন না কেন? তিনি মনে করেন, ব্যাংকের যেসব গ্রাহক ঋণের টাকা সময়মতো ফেরত দিচ্ছেন তাদেরকেই বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া উচিত।

প্রসঙ্গত, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার বেশ কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এরমধ্যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রথম প্যাকেজটিই হচ্ছে রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি ও বেতন দেওয়ার জন্য। মাত্র ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে কারখানার মালিকেরা ঋণ নিয়ে বেতন-মজুরি দেন। পরে তাদের আবেদনের কারণে আরও তহবিলের আকার বাড়ানো হয়। এপ্রিল, মে, জুন ও জুলাই এই চার মাসের বেতনভাতা দিতে সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন পোশাক শিল্প মালিকরা।

শর্ত অনুযায়ী, ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ দুই বছরে ১৮টি সমান কিস্তিতে এই টাকা তাদের ফেরত দেওয়ার কথা।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.