আলোচিত সংবাদ
সত্যের কথা বলে

স্ত্রীর লাশ আটকে লাঞ্ছিত, চিকিৎসকদের ক্ষমা করে দিলেন মুক্তিযোদ্ধা

লাঞ্ছনার শিকার মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলীর কাছে অবশেষে ক্ষমা চেয়ে দায়মুক্তি পেলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিক্ষানবিশ দুই চিকিৎসক। সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজশাহী সার্কিট হাউসে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক শোভন সাহা ও আবদুর রহিম ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধার কাছে ক্ষমা চান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সমঝোতার পর অভিযুক্তদের ক্ষমা করে দেন মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলী।

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিলের উপস্থিতিতে মধ্যস্থতা বৈঠকে ছিলেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিলুর রহমান, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী ও রাজশাহী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতারা।

সমঝোতা বৈঠক চলাকালে পুরো সময় বাইরে অপেক্ষা করছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলীর ছেলে রাকিবুল ইসলাম। তিনিও হাসপাতালে চিকিৎসকদের লাঞ্ছনার শিকার হন।

রাকিবুল বলেন, মুক্তিযোদ্ধা নেতারা সকালে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে সার্কিট হাউসে যেতে বলেছিলেন। বলা হয়েছিল, জেলা প্রশাসক সেদিনের ঘটনা শুনবেন। কথামতো বাবাকে নিয়ে সেখানে পৌঁছাই। সেখানে বাবাকে নিয়ে বৈঠক হয়। শেষে আমাকে ডেকে নেয়া হয়। ভেতরে গিয়ে সমঝোতার বিষয়টি জানতে পারি। আগে আমাদের বিষয়টি জানানো হয়নি। এ অবস্থায় নিজের সিদ্ধান্তও জানাতে পারিনি।

তিনি বলেন, সেখানে বাবার হাত-পায়ে ধরে ক্ষমা চান দুই চিকিৎসক। আমার কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন তারা। এ ঘটনার জন্য অনুতপ্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এজন্য তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি আমরা। আগামীতে আর কোনো মুক্তিযোদ্ধার পরিবার এমন পরিস্থিতির মুখে পড়বে কি-না সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই গেল।

মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলী চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। পরিবার নিয়ে রাজশাহী নগরীর টিকাপাড়া এলাকায় বসবাস করেন অবসরপ্রাপ্ত এই পুলিশ সদস্য। তার ছেলে রাকিবুল ইসলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী পরিদর্শক।

এদিকে, সমঝোতা করে এসে মুক্তিযোদ্ধারা নগরীর রেলগেট এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে রাজশাহী মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ডা. আবদুল মান্নান বলেন, উভয়পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করে দিলেন জেলা প্রশাসক। সেখানে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা ক্ষমা চেয়েছেন।

মামলার বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা ডা. আবদুল মান্নান বলেন, আমরা বলেছি মামলা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে পারব না। তখন প্রশাসন বলেছেন, মামলার বিষয়টি তারা দেখবেন।

সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধকালীন গেরিলা কমান্ডার শফিকুর রহমান রাজা, কবিকুঞ্জের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক, মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম, রবিউল ইসলাম ও নাজিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।

২ সেপ্টেম্বর রামেক হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলীর স্ত্রী পারুল বেগম (৬৫) বিনা চিকিৎসায় মারা যান। মায়ের মৃত্যুতে প্রতিবাদ করেন ছেলে রাকিবুল ইসলাম। এ সময় শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা একজোট হয়ে মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলী ও তার ছেলে রাকিবুল ইসলামকে দফায় দফায় মারধর করেন। তাদের হাত থেকে রেহাই পাননি রাকিবুলের স্ত্রী-স্বজন এমনকি সঙ্গে থাকা সহকর্মীও।

এরপর মরদেহ আটকে রেখে প্রকাশ্যে বাবা-ছেলেকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন চিকিৎসকরা। শেষে রাকিবুলকে তুলে দেন পুলিশের হাতে। পরে ক্ষমা চেয়ে স্ত্রীর লাশ নিয়ে যান মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলী।

এ নিয়ে বাবা-ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করেন হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুক্তার হোসেন। ওই মামলায় রোববার পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল পর্যন্ত তাদের জামিন দেন আদালত।

এ ঘটনায় শনিবার ওই দুই শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ও হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে আসামি করে মামলা করেন মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলী। এ মামলার আসামিদের গ্রেফতার করেনি পুলিশ।

চিকিৎসকদের ন্যক্কারজনক এ ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি কমিটি করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান করেন রাজশাহীর মুক্তিযোদ্ধারা।

একই সঙ্গে অভিযুক্তদের শাস্তির দাবিতে শনিবার থেকে আন্দোলনে নামেন মুক্তিযোদ্ধারা। একই সঙ্গে ঘটনার প্রতিকার চেয়ে রোববার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেন তারা।

ওই দিনই রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনে নামে রাজশাহীবাসী। দোষীদের বিচার এবং রামেক হাসপাতালে চিকিৎসার পরিবেশ ফেরাতে সাতদিনের আলটিমেটামও দেয়া হয়।

আলোচিত সংবাদ ০৭-০৯-২০২০ সুজাত

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.